মিসওয়াক এর গুরুত্ব ফজিলত ও পদ্ধতি

মিসওয়াক কিঃ
মিসওয়াক শব্দটি ‘সিওয়াক’ ধাতু থেকে নির্গত যার অর্থ মাজা, ঘষা। মূলত গাছের ডাল বা শিকড়কে তথা যা দিয়ে দাঁত মাজা হয় তাকে মিসওয়াক বলে।

মিসওয়াক করার গুরুত্বঃ

মিসওয়াকের গুরুত্ব বর্ণনা করে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত
প্রিয় রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যদি
আমার উম্মতের উপর কষ্ট না হয়ে
যেত, তাহলে আমি সবাইকে প্রত্যেক
সালাতের আগে মেসওয়াক করার
আদেশ দিতাম।
সহিহ আল বুখারি: ৮৪৭
অপর এক বর্ণনায় এভাবে এসেছে,
‘আমি তাদেরকে প্রত্যেক ওযুর
আগে মেসওয়াক এর জন্য আদেশ
দিতাম।’
[সহীহ, মুসনাদে আহমাদ
৭৪৬১
হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত,
রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যদি আমার
জাতির উপর কষ্ট না হতো তাহলে
প্রত্যেক ওযুর পূর্বে আমি তাদেরকে
মেসওয়াক করার আদেশ দিতাম।
[আল মু’যাম আল আওসাত,
১২৬০ হাদীসটি সহিহ।
এরপর আল আব্বাস (রা.) হতে
বর্ণিত, তিনি রাসূল (সা.) -এর
নিকট মিস্ওয়াক ছাড়া গেলেন।
তখন রাসূল (সা.) তাকে বললেন,
‘তুমি অপরিস্কার দাত নিয়ে আমার
কাছে এসেছ? যাও, মেস্ওয়াক
করে আসো। যদি আমার জাতির উপর কষ্ট না হতো,
তাহলে আমি তাদেরকে প্রত্যেক
সালাতের জন্য মেসওয়াক করা
ফরয করে দিতাম, যেভাবে সালাতের
জন্য উযু ফরয করা হয়েছে।’
মুসনাদ আল বাযযার, ১৩০৩,
সহীহ
আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল
(সা.) বলেছেন, মেসওয়াক মুখ
পরিষ্কার রাখে এবং রবের সন্তুষ্টির
কারণ।
সুনান আন নাসাঈ, ৫
হাদীসটি সহীহ।
ইবনে ওমর হতে বর্ণিত, রাসূল
(সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই
মেসওয়াক করবে, কারণ এটা মুখে
সুগন্ধ আনয়ন করে এবং তোমাদের
রব্বকে সন্তুষ্ট করে।’
মুসনাদে আহমদ, ৫৮৩১
হাদিস সহিহ।
শুরাইখ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আমি একবার মা আয়েশা (রা.)
কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘যে রাসূল
(সা.) যখন ঘরে ঢুকতেন, তখন
প্রথমে কোন কাজটি করতেন??
আয়েশা (রা.) বললেন, তিনি
সর্বপ্রথম মেসওয়াক করতেন।’
সহিহ মুসলিম: ২৫৩
সহিহ হাদিস
হুযাইফা (রা.) হতে বর্ণিত, ‘রাসূল
(সা.) যখন তাহাজ্জুদের জন্য রাতে
জাগতেন, তখন তিনি মেসওয়াক
করতেন।
সহিহ আল বুখারি, ২৪৩
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত,
তিনি বলেন, ‘রাসূল (সা.) যখন
রাত্রি জাগতেন তখন তিনি দুই দুই
রাকাত করে সালাত আদায়
করতেন এবং এরপর মেসওয়াক
ব্যবহার করতেন।’
ইবনে মাজাহ : ২৮৮
হাদিস সহিহ
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত
তিনি বলেন, রাসূল (সা.)
বলেছেন, ‘আমি মেসওয়াকের জন্য
এত বেশি আদিষ্ট হয়েছি যে, আমার
মনে হয়েছে, এর ব্যাপারে কুরআনে
কোন আয়াত নাযিল হবে অথবা
আমার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে
ওহী চলে আসবে।’
মুসনাদে আহমদ, ২৯৯৮
হাদিসটি সহীহ।
আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল
(সা.) বলেন, ‘আমাকে এত বেশি
মেসওয়াক করার আদেশ করা
হয়েছে যে, আমার আশঙ্কা হচ্ছিল
হয়তো বেশী বেশী মিস্ওয়াক
করার কারণে আমার দাত খসে
পড়বে।
মুসনাদ আল বাযযার, ২৪৫৫ সহীহ
আলী (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল
(সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর
বান্দা যখন মিস্ওয়াক করে সালাতে
দাঁড়ায়, তখন একজন ফেরেশতা
তার পিছনে এসে দাঁড়ায় এবং তার
তেলাওয়াত শুনতে থাকে। এরপর
সেই ফেরেশতা তার কাছে আসতে
আসতে এত কাছে আসে যে, সেই
ফেরেস্তার মুখ আর সালাত
আদায়কারীর মুখ একত্র হয়ে যায়।
ফলে সেই ব্যক্তির মুখনিঃসৃত
তেলাওয়াত, সরাসরি সেই ফেরেস্তার
অন্তরে প্রবেশ করে। অতএব তোমরা
কোরআন তেলাওয়াতের জন্য মুখ
পাক রাখ।
মুসনাদ আল বাযযার, ৫৬৮
মিসওয়াক নির্বাচন ও ধরণঃ

রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাইতুন ও খেজুর গাছের ডাল দিয়ে মেসওয়াক করেছেন। তাই এই দুটো হলে উত্তম। এছাড়া তিক্তস্বাধ যুক্ত গাছের ডাল হলেও ভাল। যেসব গাছের ডাল তিতা সেসব ডাল দিয়ে মিসওয়াক করা মুস্তাহাব। মেসওয়াক কাচা ও নরম গাছের ডাল হওয়া উচিত, এতে মেসওয়াকে বাড়তি ফায়দা হাসিল হয়।

মিসওয়াক করার ফজিলতঃ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন
ﺍﻟﺴﻮﺍﻙ ﻣﻄﻬﺮﺓ ﻟﻠﻔﻢ ﻣﺮﺿﺎﺓ ﻟﻠﺮﺏ
মেসওয়াক মুখের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যম ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উপায়
নাসায়ী শরীফ, হাদীস নং ৫
অন্য এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন
ﻗﺎﻝ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ : ‏« ﻓﻀﻞ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﺍﻟﺘﻲ ﻳﺴﺘﺎﻙ ﻟﻬﺎ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﺍﻟﺘﻲ ﻻ ﻳﺴﺘﺎﻙ ﻟﻬﺎ ﺳﺒﻌﻴﻦ ﺿﻌﻔﺎ ‏» ﺗﻔﺮﺩ ﺑﻪ ﻳﺤﻴﻰ ﺑﻦ ﻣﻌﺎﻭﻳﺔ ﺑﻦ ﻳﺤﻴﻰ ﺍﻟﺼﺪﻓﻲ ﻭﻳﻘﺎﻝ ﺇﻥ ﺍﺑﻦ ﺇﺳﺤﺎﻕ ﺃﺧﺬﻩ ﻣﻨﻪ
মেসওয়াক করে যে নামাজ আদায় করা হয়, সে নামাজে মেসওয়াকবিহীন নামাজের তুলনায় সত্তরগুন বেশী ফযীলত রয়েছে।
শুয়াবুল ঈমান, বাইহাকী, হাদীস নং ২৫১৯

এছাড়া আরো বহু উপকার রয়েছে:

১। মিসওয়াক আবশ্যক করে নাও, এর থেকে উদাসীন হয়ো না। তা সর্বদা করতে থাকো, কেননা এতে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্ঠি নিহিত রয়েছে।
২। সর্বদা মিসওয়াক করতে থাকলে রোজগারে সহজতা এবং বরকত হয়ে থাকে।
৩। মাথা ব্যাথা দূর হয়ে যায়।
৪। কফ দূর করে।
৫। দৃষ্টি শক্তি প্রখর করে।
৬। পাকস্থলী ঠিক থাকে।
৭। শরীরে শক্তি যোগায়।
৮। স্বরণশক্তি প্রখর করে এবং জ্ঞান বৃদ্ধি করে।
৯। অন্তরকে পরিচ্ছন্ন করে।
১০। নেকী বৃদ্ধি পায়।
১১। ফিরিশতারা খুশি হয়।
১২। মিসওয়াক শয়তানকে অসন্তুষ্ট করে দেয়।
১৩। খাবারকে হজম (পরিপাক) করে।
১৪। সন্তান জন্মদান সহজ হয়।
১৫। বার্ধক্য দেরীতে আসে।
১৬। পেটকে শক্তিশালী করে।
১৭। শরীরে আল্লাহ তা’আলার আনুগত্যের জন্য শক্তি জোগায়।
১৮। মৃত্যু যন্ত্রণা সহজ এবং কালিমা শাহাদাত নসীব হবে।
১৯। কিয়ামতে আমলনামা ডান হাতে আসবে।
২০। পুলসিরাত বিদ্যুতের ন্যায় দ্রুত গতিতে পার হওয়ার সৌভাগ্য নসীব হবে।
২১। চাহিদা পুরণে তাকে সাহায্য করে।
২২। কবরে শান্তি ও আরাম অনুভুত হবে।
২৩। তার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হবে।
২৪। দুনিয়া থেকে পাক পবিত্র হয়ে বিদায় নেবে।
২৫। সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো, এতে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি রয়েছে।
হাশিয়াতুত তাহতাবী আলা মারাকিউল ফালাহ। পৃষ্ঠাঃ ৬৮, ৬৯

মিসওয়াক করার নিয়মঃ

মেসওয়াক ধরার পদ্ধতি হল, ডান হাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলি মেসওয়াকের নিচে থাকবে। মধ্যমা ও তর্জনী উপরে ও বৃদ্ধাঙ্গুলি নিচে রেখে মেসওয়াক ধরা। এতে করে মুখের ভিতর ভালভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মেসওয়াক করা যায়। এপদ্ধতিটি হযরত ইবনে মাসউদ রাযি থেকে বর্ণিত আছে।মেসওয়াক করার মাসনূন পদ্ধতি হল, মুখের ডান দিক থেকে শুরু করা এবং উপর থেকে নিচে মেসওয়াক করা। আড়াআড়ি ভাবে না করা। মেসওয়াক করার সময় দাঁতের ভিতর বাহির সহ মেসওয়াক করা এবং জিহবাও গোড়া পর্যন্ত মেসওয়াক করা।

মেসওয়াসের মাঝে দুটি বিষয় সুন্নত, এক. মুখ পরিষ্কার করা। দুই. গাছের ডাল হওয়া। তাই গাছের ডাল ছাড়া অন্য কিছুর মাধ্যমে দাঁত মাজলে একটি সুন্নত আদায় হবে। অপরটি হবেনা। সুতরাং মেসওয়াক না থাকলে আঙ্গুল ও শুকনো কাপড় দ্বারাও মেসওয়াক করা যেতে পারে। ব্রাশের মাধ্যমেও দাঁত মাজা যেতে পারে।

মিসওয়াক কখন করতে হয়ঃ

অনেক উলামায়ে কেরাম অযুতে কুলি করার পূর্বে মিসওয়াক করার কথা বলেছেন তবে আবার কেউ কেউ বলেছেন অজুর পূর্বে মিসওয়াক করার কথা ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে

নামাযের আগে

মজলিসে যাওয়ার পূর্বে এবং কুরআন ও হাদিস তিলাওয়াত করার পূর্বে মিসওয়াক করা মুস্তাহাব।

শেষ কথাঃ
মিসওয়াক ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। এই আমল প্রত্যেকের করা জরুরি। প্রত্যেক পিতা-মাতার উচিত সন্তানকে ছোট অবস্থায় মিসওয়াক করার উপকারিতা বর্ণনা করে মিসওয়াক করাতে অভ্যস্ত করা এছাড়া একজন আরেক জনকে মিসওয়াক হাদিয়া তথা উপহার হিসাবে দেয়া উচিত এতে ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা বৃদ্ধির পাশাপাশি সওয়াব এবং ইসলামের দাওয়াত হয়ে যায়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে তাওফিক দিন ।

Check Also

উপজেলা পরিষদ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ২০২১

উপজেলা পরিষদ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, উপজেলা-১ শাখার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *