সংবাদ শিরোনাম
Home / খোলামত / করোনা: কারো জন্য আপনি সংখ্যা,আর কারো কাছে পুরো পৃথিবী

করোনা: কারো জন্য আপনি সংখ্যা,আর কারো কাছে পুরো পৃথিবী

‘আমি তো দেখেছি জীবনের খেয়াঘাটে কত আপন মানুষকে হঠাৎ হঠাৎ অচেনা হয়ে যেতে।’ এ কথাটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের। [ওবায়দুল কাদের, এ বিজয়ের মুকুট কোথায়, পাতা-১৯১] বর্তমান বিশ্বের অতিমহামারী কোভিড-১৯ বা করোনা এ কথাটি কে ভয়াবহভাবে বাস্তব রূপদান করেছে আমাদের জীবনে। যতদিন যাচ্ছে ততই আমরা এর ভয়াবহ সামাজিক রূপ দেখতে পাচ্ছি।

ঢাকা মেডিকেলে ছেলে তার মাকে রেখে পালিয়ে গেছে, ফেনীতে একজন বাবা বাসায় তাঁর রুমের মধ্যে মারা গেছেন শুধুমাত্র তাঁর সন্তান ও স্ত্রীর অবহেলায়। এই সময়ে তারা বাহির থেকে দরজাটি বন্ধ করে বাসায় রেখে চলে গেছে। তাঁর অনেক চিৎকারে ও এগিয়ে আসেনি তাঁর প্রিয়তম জীবনসঙ্গিনী, তাঁর সন্তানেরা। টাঙ্গাইলে মাকে জঙ্গলে রেখে সন্ধ্যার পর পর ছেলেরা পালিয়ে গেছে। এইরকম আরো অনেক ভয়াবহ ঘটনা আমাদের চারদিকে ঘটছে। অথচ আমাদের একটু সচেতনতা পারে অনেক জীবন বদলে দিয়ে, অনেক জীবন ফিরিয়ে দিতে। আমাদের অসচেতনতা কিংবা উদাসীনটা আজ চরম বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমাদেরকে।

দীর্ঘ প্রায় দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে লকডাউন থাকার পর গত ৩১ মে থেকে লকডাউন উঠিয়ে দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে সবকিছু চালু করা হয়। চালু হয়েছে সরকারি-বেসরকারি অফিস, গণপরিবহন যেমন বাস, লঞ্চ এবং ট্রেন। খুলে দেয়া হয়েছিল ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো, মার্কেট, শপিংমল ইত্যাদি। যদিও এইসব ক্ষেত্রে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলা হয়েছিল।

যদিও কিছু লোক সাধারণ ছুটি তুলে দেওয়াকে অভিহিত করেছেন ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ বলে কিংবা ‘সীমিত পরিসর’ নিয়ে হাসাহাসি করেছেন। হাসাহাসি যে কেউ করতেই পারে সেই স্বাধীনতা নিশ্চয়ই তাঁর রয়েছে। যারা এই হাসাহাসি করছেন তাদের কারণে আজ বাংলাদেশ পুলিশের প্রায় ৬ হাজার সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন এবং ইতিমধ্যে ১৭ জন পুলিশ জীবন দিয়েছেন। এছাড়াও প্রশাসনের অন্যান্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন সমানতালে। কিন্তু এই হাসাহাসিটা না করে আমরা যদি আমাদের আশেপাশের কর্মহীন, দরিদ্র, দুস্থ ও আসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতাম অথবা সামর্থ্য না থাকলে অসেচতন কিছু লোককে সচেতন করতাম তাহলে ও বোধ করি সামান্য হলেও দেশের উপকার হতো। কিন্তু না আমরা সমালোচনা তে বীর বাহাদুর। নিজের দায়িত্বের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদাসীন। আমরা যারা ভারতে হাতি ও তার বাচ্চাটি নির্দয়ভাবে মারা যাওয়ায় শোকে মুহ্যমান হয়েছি, এই আমরাই আমাদের দেশে মা ইলিশ বা ডিমওয়ালা ইলিশ খেতে একটু ও চিন্তা করি না। যদিও আমাদের সরকার এই ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেয় আমরা মানি না। এই ইলিশ কিন্তু গরীবরা খায় না, খেতে পারে না।

দুই থেকে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে কর্মজীবী মানুষেরা বেকার বসে রয়েছেন। ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে তাদের। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠাগুলো আজ প্রায় ভঙ্গুর অবস্থার দিকে যাচ্ছে। সরকারি, বেসরকারি সহযোগিতা দেয়ার পরেও সেটা তাদের পরিবারের সকলের প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম হয়নি এবং তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলা যায়।

এই সময়ে বন্ধ রয়েছে আমাদের অর্থনীতির চাকা। করোনায় ক্ষতির অঙ্ক হতে পারে ৫ লাখ ৮০ হাজার কোটি থেকে ৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলার (এক ট্রিলিয়নে এক লাখ কোটি)। আর এই ক্ষতি বৈশ্বিক জিডিপির ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ হবে। এই আশঙ্কার কথা খোদ এডিবি’র। তাদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) জনিত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি থেকে ২১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের মতো। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশে করোনা মোকাবিলায় কঠোর বিধিনিষেধের কারণে সার্বিকভাবে এবার দক্ষিণ জিডিপি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ কমবে।

আমাদের অর্থনীতিবিদদের মতে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ওপরে অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে এবং দেশের শ্রমজীবীসহ সকল মানুষের কল্যাণের জন্যই লকডাউন বা সাধারণ ছুটি খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র অর্থনীতির একটি দেশ। তাই এখানে মাসের-পর- মাস অর্থনৈতিক অচলাবস্থা চলতে থাকলে ফলশ্রুতিতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতি আমরা কেউই চাইনা। শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো পর্যন্ত অর্থনৈতিক অবস্থার কথা চিন্তা করে লকডাউন তুলে দিয়েছে।

সরকার জনগণকে বার বার স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে সচেতন করে যাচ্ছে। কিন্তু এখনো অনেক মানুষই মানছেন না সরকারি নির্দেশনা। অনেকে মাস্ক ও পরছে না।

মাস্ক পরিধান নিজেকে যেমন আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে তেমনি আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে ভাইরাস ছড়াতেও প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে থাকে। করোনা ভাইরাস ঠেকাতে মাস্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে উল্লেখ করেছেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ও রয়্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ড. ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন। তিনি একটি ব্রিটিশ টিভি চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন। [বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৯ মে ২০২০]

ঈদের পর থেকেই লোকজনের মধ্যে মাস্ক পড়ার প্রবণতা কমে গেছে বলে লক্ষ্য করছি। অনেক দোকানদারের মুখে মাস্ক নাই, হ্যান্ড গ্লাভস নাই, অটো বা সিএনজি চালকের কিংবা অনেক যাত্রীরও মুখে মাস্ক নাই। অনেকে আবার মাস্কের কথা জিজ্ঞেস করলে পকেট থেকে বের করে পরিধান করেন। কেউ কেউ মিথ্যা গল্প ফাঁদেন। মাস্ক এর পরিবর্তে মুখে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা, কাগজ বা টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ ঢেকে রেখে দায়িত্বরতদের ফাঁকি দেয়া চলছেই।

মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে দিন দিন বাড়ছেই। তবু সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার কথা চিন্তা করে লকডাউন তুলে দেয়া হয়েছে।

কিন্তু অসচেতন বা গাফিলতির কারণে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে নিজেই নিজের ক্ষতি করছেন। এর জন্য আপনি আমি নিজেই দায়ী। কোনভাবেই অন্য কেউ নয়।

রমজানের ভিতর মার্কেট খুলে দেয়ার পর যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সরকার বাধ্য হয়ে আবার বন্ধ করে দিয়েছিল বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা মার্কেট। এখন ও মনে হয় পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছে।

সারাবিশ্বে ইতিমধ্যে ৬৯ লাখ ১০ হাজার ১৪৬ জন ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন । এদের মধ্যে মারা গেছেন চার লাখ ১৩ জন ব্যক্তি। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই ৬৫ হাজার ৭ শত ৬৯ জন আক্রান্ত ও ৮৮৮ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। [সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ৭ জুন,২০২০] করোনা ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে আরো অনেক মানুষ।

মাস্ক না পড়ে বাইরে কাজে বের হয়ে কিংবা অযথা ঘোরাঘুরির জন্য বাইরে বের হয়ে মিথ্যা কথা বলে পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেটকে ধোঁকা দিতে পারবেন কিন্তু করোনাভাইরাসকে ধোঁকা দিতে পারবেন ? পারতেছেন কি আধো?

আক্রান্ত বা মৃত ব্যক্তিকে সরকারি বা বেসরকারিভাবে সংখ্যায় প্রকাশ করা হয় কিন্তু মনে রাখা উচিত আপনি আমি যে আপনজনের জন্য বাইরে কাজ করতে যাচ্ছি তাদের কাছে আপনি আমি শুধু সংখ্যা নয়, নির্ভরতার জায়গা, আশ্রয়স্থল। কারো কাছে আমি আপনি পুরো পৃথিবী।

তাই আপনি বাইরে বের হয়ে আক্রান্ত হলে বাসায় যারা রয়েছেন তারাও আক্রান্ত হতে পারেন। নিজেকে সুরক্ষিত রাখুন আর সুরক্ষিত রাখুন প্রিয়জনদের।

অত্যন্ত লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ইতোমধ্যে সেলুন আর চায়ের দোকান খুলে ফেলেছে। এ দুটো জায়গা থেকে সবচেয়ে বেশি ছড়াতে পারে করোনা ভাইরাস। আমেরিকার একটি সেলুন থেকে ১৪০ জন আক্রান্ত হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর এসেছে। চায়ের দোকানে চা খাওয়ার সাথে চলছে টিভি দেখা আর আড্ডা দেয়া। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যদি নরসুন্দর কাজ করে তবে চুল কাটাতে পারেন কিন্তু এই সময় বাইরে চা খাওয়া কিংবা দোকানে আড্ডা দেয়া চলতে পারে না। এটিকে বলা চলে খাল কেটে কুমির আনার সমান। এটি কিন্তু আমি আপনি স্বেচ্ছায় করছি। আমরা আর কিছু করতে না পারি অন্তত নিজে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারি। আমাদের আশেপাশের লোকদেরকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে করতে অনুরোধ করতে পারি।

গণপরিবহনে গাদাগাদি করে উঠা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রয়োজনে অনিয়ম দেখলে প্রতিবাদ করতে পারি।

আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকার ইতিমধ্যেই সাধ্যমত করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সকল ধরনের প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। আমাদের দরকার সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। নিজে সচেতন হওয়া, অন্যকে সচেতন করা। ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে আমাদের অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপনের ফলাফল। প্রতিদিনই আমাদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার রেকর্ড করছে। আমরা আমাদের জীবন কে নিয়ে যাচ্ছি গভীর অন্ধকারের দিকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলা যায়-

“আমাদের গেছে যে দিন

একেবারেই কি গেছে,

কিছুই কি নেই বাকি।“
আমরা আমাদের ফিরে ফেতে চাই । এই করোনায় আমরা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানুষিক বিপর্যয়ের মধ্যে নিজেদের হারিয়ে ফেলছি। কেমন যেন জীবন খুঁজে ফিরছি আমরা। আবার ও ওবায়দুল কাদেরর ভাষা চলে আসে- “পথিক মনে হয় পথ হারিয়ে ফেলেছে। আঁকাবাঁকা দুর্গম পথে গন্তব্য খুঁজে পায় না। সংকটের বিস্তীর্ণ কাঁটাবনে এই পথচলা ফুরবে কবে কেউ জানে না। শুধু জানে, তরঙ্গ সংকুল জীবন নদীতে কচুরিপানার মতো ভেসে ভেসে চলতে হবে।“ [ওবায়দুল কাদের, এ বিজয়ের মুকুট কোথায়। পাতা-১৮৯]

আমরা আমাদের জীবন খুঁজে নিতে পারি। আমরা আমাদের কে বাঁচাতে পারি। জানি না কতদিন চলবে কতদিন থাকবে এই মহামারী। যতদিন এই মহামারী, লকডাউন, সাধারণ ছুটি চলবে ততদিন আমরা আমাদের নিজেদের কে নিরাপদ রাখতে হবে। যতদিন এই পরিস্থিতি চলবে ততদিন পৃথিবীতে আমরা বেরবো – মাস্ক, স্যানিটাইজার, ফিজিক্যাল ডিস্টান্সিং এগুলোকে সারাক্ষণের সঙ্গী করে। এটাকেই ‘নিউ নরমাল’ বলা হচ্ছে। এই নিউ নরমাল কতদিনের? সেই উত্তর ও আমাদের কারোর জানা নেই।

তাই আসুন আমরা সচেতন হই, ধৈর্যশীল হই আর নিজেদের আত্মসংবরণ করি। নিজের আশে পাশের সবাই কে সচেতন করি। নিজের জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করি। নিজে সুস্থ থাকলে ভালো থাকবে পরিবার, ভালো থাকবে প্রিয় মানুষগুলো, ভালো থাকবে আমাদের সমাজ। ভালো হয়ে উঠবে আমাদের এই পৃথিবী ।

লেখক: উপদেষ্টা, সময় এক্সপ্রেস নিউজ

About খাজা খায়ের সুজন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

এই বাংলাদেশ আমার নয়

মানুষ মানুষের জন্যে। এটা শুধু গানের কথা নয়। প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে আমরা এর সাক্ষী। মানুষ জানে …

জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে সচল রাখতে হবে অর্থনীতি

করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ মহামারী প্রতিরোধে কার্যত অবরুদ্ধ সারাবিশ্ব। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। মূলত গত দুই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *