Home / খোলামত / ১৫ ই আগস্ট হত্যাকাণ্ড একটি জাতিগোষ্ঠী ও জাতিসত্তাকে গণহত্যার সামিল

১৫ ই আগস্ট হত্যাকাণ্ড একটি জাতিগোষ্ঠী ও জাতিসত্তাকে গণহত্যার সামিল

পৃথিবীতে যুগে যুগে বহু ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের উদয় ঘটেছে। এদের মধ্যে যারা তাঁদের সংগ্রামের ফসল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন একটি রাষ্ট্র একটি জাতিসত্তা। উল্লেখযোগ্যভাবে বলা যায়  জর্জ ওয়াশিংটন, মোস্তফা কামাল পাশা, মহাত্মা গান্ধী, হো-চিন-মিন, ইয়াসির আরাফাত, নেলসন ম্যান্ডেলা, চেগুয়ে বারা সহ আরো অনেকে। এরা সবাই স্বপ্ন দেখেছেন স্বাধীন রাষ্ট্রের। আরো উন্নত দেশ ও স্বজাতি সত্তার বিকাশের এবং অধিকার আদায়ের। ঠিক তেমনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের। আমাদের ইতিহাসের মহানায়ক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যিনি মানবের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে কালজয়ী মহাপুরুষেরা অনেকেই প্রাণ দিতে হয়েছে কিংবা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। বিশ্বে রাজনৈতিক হত্যার অন্যতমগুলো হলো ভারতের মহাত্মা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, চিলির সালভাদর আলেন্দে, যুক্তরাষ্ট্রের আব্রাহাম লিংকন, মার্টিন লুথার কিং ও জন এফ কেনেডি, মিয়ানমারের জেনারেল অং সান ও সিংহলের প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দর নায়েক, গানার নক্রুমা ইন্দোনেশিয়ার আনোয়ার সাদাত সহ আরো অনেকে। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ড গুলোকে ছাড়িয়ে যেটি সবছেয়ে বর্বরোচিত সেটি হচ্ছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ড। এটি কোন ব্যক্তি হত্যাকাণ্ড বলা যায় না, এটি হচ্ছে সদ্যস্বাধীন একটি দেশকে তার পূর্বের ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়ার জন্য এবং এই জাতিসত্তা যার হাত ধরে বিশ্বে প্রকাশ পেয়েছে সেই জাতিসত্তার পরিচয় মুছে ফেলার জন্য এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। তাই এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্বের বুক থেকে একটি জাতিগোষ্ঠী ও জাতিসত্তার সমূলে ধ্বংস করার অপপ্রয়াস ছিল। এটি আরো পরিষ্কার হয়ে বঙ্গবন্ধু কে হত্যার পর এই হত্যার মাস্টারমাইন্ড ও পরবর্তী সুবিধাভোগী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একজন নেতা ছিলেন যিনি বিশ্বের বুকে একটি জাতিসত্তা কে অমর করেছেন। যিনি বিশ্বের বুকে এঁকেছেন একটি মানচিত্র, দিয়েছেন জাতীয় পতাকা, এক বছরের ব্যবধানে দিয়েছেন একটি সার্বভৌম সংবিধান। যিনি তাঁর রাজনীতির শুরুতে আন্দোলনের মাধ্যমে আদায় করেছেন বাঙালী জাতির ভাষার অধিকার। যেটি বিশ্বের বুকে একমাত্র বিরল ইতিহাস। যিনি অধিকার আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি ছাত্র সংগঠন। তিনি ছিলেন এমন নেতা তিনি যা মুখে বলতেন তা অন্তরে বিশ্বাস করতেন। যিনি একটি কোট পরতেন যেটি ‘মুজিব কোট’ নামে পরিচিত, আর এই মুজিব কোটের ছয়টি বোতাম ছিল তাঁর রচিত ছয় দফার প্রতীক। তিনি যা মুখে বলতেন তা অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করতেন। তাঁর এই বিশ্বাসের ভিত্তি ছিল বাঙালীর ভালোবাসা এবং বাঙালীর প্রতি গভীরতম ভালোবাসার প্রকাশ।

‘বাংলাআমারভাষা।বাংলারমাটি, আমারমাটি।

বাংলারকৃষ্টি, বাংলারসভ্যতাআমার।আমি

বাঙালিজাতীয়তাবাদেবিশ্বাসকরি।’

(১৮ফেব্রুয়ারি১৯৭৩, চাঁদপুরেদেওয়াভাষণ) এটিছিলবঙ্গবন্ধুরবিশ্বাসেরভিত্তি।মননে মগজে, চলনে বলনে যিনি ছিলেন একজন পুরোদস্তুর বাঙালী। বঙ্গবন্ধুর হাত দিয়েই প্রতিষ্ঠিত ও স্থায়ী রূপ লাভ করে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিশ্বের সবছেয়ে ভয়াবহতম ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডটি ঘটায় ঘাতকের দল।

ঘাতকের দল অনুধাবন করে ফেলেছিল বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু মানেই বাঙালী জাতির স্বর। বঙ্গবন্ধু মানেই আমাদের ইতিহাসের ১৫০০ শত বছরের ব্যর্থতার ইতিহাসকে পেছনে ফেলে নতুনের কেতন উড়ানোর ইতিহাস। তাই তারা পনের আগস্ট শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু হত্যা করেনি তারা সেই সাথে বঙ্গবন্ধুর রক্তের যত উত্তরাধিকার ছিল তাঁদের সবাইকে হত্যা করেছে । এই হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড ছিল জেনারেল জিয়াউর রহমান। হত্যাকারী বলতে আমরা শুধু মঞ্চের কিলার দেরই চিনি, কিন্তু নেপথ্যের নায়করা ও থাকে। তেমনি জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিল নেপথ্যের নায়ক। এ সম্পর্কে সাপ্তাহিক ‘বাংলার ডাকে’ আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখেছেন- “বঙ্গবন্ধু কে হত্যার পর পরই আমার মনে হয়েছিল, সিআইএ তাদের আসল লোকটাকে মাঠে নামায়নি। ফারুক, ডালিম, মোশতাককে সামনে ঠেলে দিয়ে প্রথম পর্যায়ে ধুম্রজাল সৃষ্টির চেষ্টা করেছে মাত্র।“ কিলার কর্নেল ফারুক সাংবাদিক এন্থনী মাসকারেনহাস কে বলেন, আমাদের প্রথম পছন্দ ছিল জেনারেল জিয়া, কারণ সে কলংকিত ছিল না। বহু কষ্ট করে ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ জিয়াউর রহমান এর সাথে সন্ধ্যায় সাক্ষাৎ করি। জেনারেল জিয়া বললেন, “আমি একজন সিনিয়র অফিসার, আমি এভাবে জড়াতে পারি না। যদি তোমরা জুনিয়র অফিসাররা এটা করতে চাও, এগিয়ে যাও।“

১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চিলিতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্যাল্ভাদর আলেন্দের হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হয় দেশটির সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল পিনোশের নেতৃত্বে। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্টের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কে। উল্লেখ্য তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব হেনরী কিসিঞ্জারের ফরেন এনিমির তালিকায় ছিল চিলির সাল্ভাদর আলেন্দে, ভিয়েতনামের থিউর ও বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান। আর প্রত্যেকটি হত্যাকণ্ড ঘটানো হয় সেনাবাহিনী দিয়ে। সামরিক চক্রান্তকারীদের পক্ষে মেজর রশিদ হত্যাকানণ্ডের রাজনৈতিক নেতৃত্বের(মোশতাক) সাথে যোগাযোগ করেছেন এবং মেজর ফারুক যোগাযোগ করেছেন অন্যান্য সহকর্মী ও তাঁর গুরু ডেপুটি চীফ অব স্টাপ জেনারেল জিয়াউর রহমানের সাথে।১৯৭৬ সালে সংক্ষিপ্ত গোপন বিচারের জবানবন্দীতে কর্নেল তাহের বলেন, “দিন কয়েকের মধ্যেই বুঝতে পারলাম মুজিব হত্যার পেছনে রয়েছে পাক মার্কিন ষড়যন্ত্র।“ বঙ্গবন্ধু কে হত্যার মূল দুই কিলার মেজর ফারুক ও রশিদ। জেনারেল জিয়া ছিলেন মেজর ফারুকের চাইতে ১৩ বছরের সিনিয়র। ১৯৬৫ সালে ফারুক ও রশিদ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং রিসালপুরস্থ সামরিক একাডেমীতে প্রশিক্ষণ নেন। ঐ সময় জেনারেল (মেজর) জিয়া ছিলেন সেখানকার একজন প্রশিক্ষক । সেই একডেমীতেই জিয়ার সাথে ফারুক ও রশিদের পরিচয় ও আন্তরিকতার সূত্রপাত। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর এজেন্ট হয়ে নভেম্বর মাসে তারা ভারতে প্রবেশ করে। সন্দেহবশত কর্নেল ওসমানী তাদের গ্রহণ করলেন না, কিন্তু তাদের আশ্রয় দিলেন তাদের প্রশিক্ষক মেজর জিয়া। জিয়ার মাধ্যমে তারা ঢুকে গেলেন বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন ‘জেডফোর্সে’।

 

পূর্বেই আলোচনা করেছি বিশ্বে বহু রাষ্ট্রনায়কের হত্যাকাণ্ডের কথা, কিন্তু কিভাবে জেনারেল জিয়া এই হত্যার মূল কুশীলব ও এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে একটি জাতিগোষ্ঠী ও জাতিসত্তার গণহত্যার সামিল তা আলোচনা করছি। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত ১৭ আগস্ট ২০২০ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আলোচনা সভায় বলেছেন, ‘ঘাতকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধু কে হত্যার মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তাকে, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অহংকার কে হত্যা করতে চেয়েছিল।“ মূল ব্যাপারটি এখানেই। হত্যাকারীরা শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারতো। মূলত তাদের লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু নয়, তাদের লক্ষ্য অরো সুদূর পরাহত ছিল তারা ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্বাধীন হওয়া বাঙ্গালীদের উপর তাঁদের মূল ক্ষোভ ছিল। তাই তারা চায়নি বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেই বেঁছে থাকুক। থাকলে এই রক্ত মাথাচাড়া দিয়ে উঠবেই। এজন্য এই হত্যাকাণ্ড ছিল বিশ্বের বুকে নজিরবিহীন ঘটনা । এ জন্য বিশ্বের বুকে ঘটে যাও দুই একটি হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করা দরকার।

সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলফ পালম কে ১৯৮৬ সালে হত্যা করা হয়। সিনেমা হল থেকে স্ত্রীর সঙ্গে বাড়ি ফেরার সময় পালমে কে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল পেছন থেকে। ওইদিনই নিরাপত্তা রক্ষীদের বিদায় জানিয়েছিলেন ওলফ পালম। অথচ ওইদিন তাঁর পাশেই ছিলেন তাঁর স্ত্রী তাঁকে হত্যা করা হয়নি।

সালভাদর আলেন্দে ১৯৭০ সালে চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তাঁকে উত্তর-দক্ষিন আমেরিকার প্রথম মার্কসবাদী প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭৩ জেনারেল আগুস্তো পিনোশের নেতৃত্বে এক সেনা অভ্যূত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। পিনোশের অনুগত সেনা ও বিমান হামলার পর আলেন্দের মৃতদেহ প্রেসিডেন্ট প্যালেসের ভিতরে পাওয়া যায়। অথচ প্রেসিডেন্ট ভবনে তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়।

পাত্রিস লুমুম্বা ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর স্বাধীনতার স্থপতি। তিনি ছিলেন বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী নেতা ও সাহিত্যিক। তাঁর আসল নাম ছিল এলিয়াস ওকিত আসম্বো। ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লুমুম্বা ও কাসাভুবুকে পদচ্যুত করা হয়। ডিসেম্বরে গ্রেফতার হন লুমুম্বা। জানুয়ারী মাসের ১৭ তারিখ বন্দী অবস্থায় হত্যা করা হয় কঙ্গোর স্বাধীনতার স্থপতি লুমুম্বাকে। এরপর কঙ্গো চলে সামরিক বাহিনীর হাতে।

ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী বিশ্বব্যাপী যার পরিচিতি ইন্দিরা গান্ধী নামে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও মা কমলা নেহেরুর একমাত্র সন্তান ইন্দিরা গান্ধী। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। একটি খারাফ সময়ে শক্ত হাতে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষার গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিষাদময় পরিণতি বরণ করতে হয় তাঁকে। পবিত্র স্বর্ণমন্দিরের অবমাননা আর খালিস্তানের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দেওয়ার প্রতিশোধস্বরূপ ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪, সাৎওয়ান্ত সিং ও বেয়ান্ত সিং নামে নিজের দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ভারতের চার বারের প্রধনামন্ত্রী ইদন্দিরা গান্ধী। ওইসময় তাঁর পরিবারের উপর কোন হামলা করা হয় নি।

অথচ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিশ্বের ইতিহাসের ভয়াবহ নিষ্ঠুর ও জগন্যতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমেহত্যা করা হয়েছিল আমাদের ইতিহাসের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতির জনকের সহধর্মিণী মহিয়সী নারী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, জাতির জনকের জ্যেষ্ঠপুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, দ্বিতীয় পুত্র মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, তাঁদের নবপরিণীতা স্ত্রী সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠপুত্র শেখ রাসেল বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর স্ত্রী, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সহ আরো অনেককে। এই হত্যাকাণ্ডে মস্তক বির্দীন করা হয়েছিল ছোট্ট শিশুর, হত্যা করা হয়েছিল অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে। অবাধে হত্যা করা হয়েছিল নারীদের কে। তচনচ করা হয়েছিল বাঙালীর তীর্থস্থান ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারের বঙ্গবন্ধুর বাড়ীকে।

মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিজয়কে ড. কিসিঞ্জার তার ব্যক্তিগত পরাজয় বলে মনে করতো।

আর বাংলাদেশে হত্যা-ষড়যন্ত্রের মূল হোতা ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ১৯৭১ সালে আমেরিকার সঙ্গে মিলিত হয়ে মোশতাক স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। তবে কিসিঞ্জার-ভুট্টোদের পছন্দের আসল লোকটি হচ্ছে জিয়াউর রহমান। আর এ জন্যই মোশতাককে ডামি হিসেবে ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতির গদিতে বসিয়ে ৮০ দিনের মাথায় তাকে সরিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসানো হয় জিয়াকে। জিয়ার মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করা হয়। এটা ঠিক যে, সেনাবাহিনীর তৎকালীন উপপ্রধান জিয়াউর রহমান নেপথ্যে থেকে মদদ না দিলে কোনভাবেই মুজিব হত্যা সম্ভব হতো না। খুনিদের মদদদাতা, আশ্রয়দাতা, প্রশ্রয়দাতা ও পুরস্কারদাতা ছিলেন এই জিয়াউর রহমান। আবীর আহদের ভাষায় বলা যায়, “যে কোন দেশে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের অন্তরালে থাকে একটি রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব। এ নিরিখে ১৫ আগস্টের ক্ষমতার পালাবদল কার্যক্রমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সার্বিক রাজনৈতিক ক্ষমতার মঞ্চে আবির্ভূত হলেন খোন্দকার মোশতাক এবং সামরিক নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। অর্থাৎ মোশতাক-জিয়ার যৌথ নেতৃত্বেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল সংঘটিত হয়।“

কেন অবাধে হত্যা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র সহ সবাইকে এপ্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কিলার মেজর রশিদ এর কথায় স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যেটি বলেছিল ভারতীয় লেখক সলীল ত্রিপাঠিকে ১৯৮৬ সালে একটি সাক্ষাৎকারে, আর এই সাক্ষাতকারের উপর ভিত্তি করে করে সলীল ত্রিপাঠি একটি বই লিখেন ‘দ্যা কর্নেল হু উড নট রিপেন্টঃ দ্য বাংলাদেশ ওয়ার এন্ড ইটস আনকোয়াইট লেগাসি’ এখানে পাওয়া সাক্ষাৎকার অনুযায়ী মেজর রশিদ কে প্রশ্ন করা হয়েছিল মুজিবের শিশু পুত্রটিকে কেন হত্যা করা হয়েছিল? তার স্পষ্ট উত্তর ছিল আমরা চাইনি মুজিবুর রক্তের কেউ বেঁচে থাকুক। এই বংশটি আমাদের জন্য হুমকিস্বরুপ ছিল। তার এই জবানীর মাধ্যমে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় তাঁদের ক্ষোভ এই জাতিসত্তার উপর ছিল প্রবল। তারা কোনভাবেই বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ মেনে নিতে পারেনি। তারা মেনে নিতে পারেনি ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশ।

কেন এই হত্যাকাণ্ড একটি জাতিগোষ্ঠী ও জাতিসত্তার উপর গণহত্যার সামিল তা বোঝানোর জন্য একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ এখানে উল্লেখ না করে পারছি না। তা হচ্ছে ওয়াং চেং, চীনের চ’ইন বংশের চতুর্থ সম্রাট।  যিনি চীনের ডিউক অব চ’ইন চীনের প্রাচীন চৌবংশকে ক্ষমতাচ্যূত করে রাজসিংহাসনে বসেন খ্রিস্টপূর্ব ২৫৫ সনে। তিনি গদিতে বসে নিজেকে চীনের প্রথম সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিহ হুয়াং তি নাম ধারণ করেন। শিহ হুয়াং তি মানে ‘প্রথম সম্রাট’। তারপর চীনের দু’হাজার বছরের ইতিহাসের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানে নেমে পড়েন। শিহ সদম্ভে বললেন-চীনের ইতিহাস আমাকে দিয়েই শুরু। আমিই চীনের প্রথম সম্রাট। এভাবে তিনি চীনের দু’হাজার বছরের বিভিন্ন রাজবংশের অসংখ্য শাসককে ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে মুচে ফেলার চক্রান্তে মেতে উঠেন। চীন ভূখণ্ডে কোন পূর্বসূরির স্মৃতিকে তিনি সহ্য করতে পারেন নি। এমনকি কনফুসিয়াসের ধর্মীয় বইগুলো সরকারী রোষানল থেকে রক্ষা পায়নি। ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তিনি হবেন স্মরণীয়-বরণীয় এই লক্ষ্যেই কাজ করে গেছেন ডাণ্ডার জোরে, রক্তচক্ষুর শাসানিতে আর নরহত্যার মাধ্যমে।

ঠিক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন হত্যাকাণ্ডের মূল নায়ক রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান। যিনি এসেই বাঙালীর ১৫ শত বছরের অমোঘ বাঙালী সত্তা কে বাদ দিয়ে আমাদের উপর চাপিয়ে দেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নামক এক তত্ত্ব। যিনি পাকিস্তানী কায়দায় ফিরত আনেন বাংলাদেশ জিন্দাবাদ নামক নতুন সুর, যিনি খুব দ্রুততার সাথে নিধন করতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধাদের, স্বাধীনতার ইতিহাস শুরু করেন ২৭ মার্চ দিয়ে। বাঙালি কৃষ্টি কালচার কে চিরতরে ঝেটিয়ে বিদায় দেওয়ার চেষ্টা করেন । ওয়াং চেনের কায়দায় জিয়াউর রহমান শুরু করেন বাঙালি জাতির বীরত্বপূর্ণ স্বাধীনতার ইতিহাস কে নিজের ঝুলিতে নেয়ার। অসংখ্য ঘটনা ঘটে বাঙালী জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করার, বিভ্রান্তি ছড়ানোর, জবরদখল করার এবং শাসককুলের মনগড়া ইতিহাস রচনার।

একটি জাতিগোষ্ঠী কে যারা স্বমূলে ধ্বংসের প্রয়াসে সেদিন জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে যে হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছিল অনেক পরে হলে তাদের বিচার হয়েছে। কিন্তু বিচার হয়নি এই হত্যাকাণ্ডের মূল কুশীলব মোশতাক ও জিয়ার। এদের মরণোত্তর বিচার এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের বিচার ও করতে হবে। এদের বিচার ও হবে কারণ সেদিন পরম করূণাময়ের ইচ্ছায় বেঁছে গিয়েছিলেন আমাদের আশার প্রদীপ বঙ্গবন্ধু কন্যা “যিনি ধ্বংস্তুপে দাঁড়িয়ে উড়ান সৃষ্টির পতাকা। তিনি মরণের মিছিলে দাঁড়িয়ে জয়গান গান জীবনের।“ দেশরত্ন শেখ হাসিনা এবং তাঁর অদরের ছোট বোন শেখ রেহানা। এই বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এটাই কাম্য থাকবে যেন এই দেশের উপর এই জাতিসত্তার উপর কোন হায়েনারা যেন চোখ তুলে না তাকায়।

উপদেষ্টা, সময় এক্সপ্রেস নিউজ

kk.sjon401@gamil.com

About খাজা খায়ের সুজন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

নির্বাসনের দিনগুলো ও হৃদয়বিদারক ১৫ আগস্টের কালো রাত

খুব ভোরে প্রচণ্ড ভাঙচুরের আওয়াজে আমার ঘুম ভাঙে। উঠে দেখি মা নেই পাশে। বিছানায় শুধু …

রেলকে জনবান্ধব করার হাত দিয়েই পুরস্কার পেলেন ওএসডি!

এদেশে ভালো কাজ করলেই সোজা বান্দরবান বদলির রেওয়াজ আছে। অল্প কয়েকদিনে রেলের যে লক্করঝক্কর চেহারা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *